নিউইয়র্কের ‘সুপার হিরো’ বাংলাদেশি চিকিৎসকের গল্প

0
57

 

 

 

 

 

করোনাভাইরাস বিশ্বকে এক নতুন বাস্তবতার মুখে ফেলে দিয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশই এমন সংকটের জন্য প্রস্তুত ছিল না। সেটা হোক যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাক্রমশালী দেশ বা বাংলাদেশের মতো কোনো উন্নয়নশীল দেশ। তারপরও সারাবিশ্বে করোনাভাইরাস যে মানবিক সংকট তৈরি করেছে, তার বিরুদ্ধে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন চিকিৎসকরা।

আর এই ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধাদের অনেকে আবির্ভূত হয়েছেন মানবতার ত্রাতা হিসেবে। এমনই একজন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশি ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার। বিশেষত নিউইয়র্কে যে বাংলাদেশিরা আছেন, তাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় আশা ও ভরসার প্রতীক ম্যানহাটনের প্রাচীনতম মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।

করোনাভাইরাসের ভয়ে যেখানে বিশ্বের অনেক বাঘা বাঘা ডাক্তার তাদের চেম্বার বন্ধ করে অন্দরে ঢুকে গেছেন, যেখানে বাংলাদেশের মতো দেশে হাসপাতাল পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সেখানে নিউইয়র্কের মতো মৃত্যুপুরীতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন ডা. ফেরদৌস। নিউইয়র্কে যখন করোনা থাবা বসিয়েছে, তখন থেকে দিনের পর দিন এ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ফেরদৌস। চিকিৎসাবঞ্চিত করোনা আক্রান্ত রোগীরা তাই এই সম্মুখ যোদ্ধার নাম দিয়েছেন ‘ডক্টর অব হিউম্যানিটি’বা মানবতার চিকিৎসক।

এ বিষয়ে ডা. ফেরদৌস খন্দকার বলেন, গত চার সপ্তাহ প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা কাজ করছি। নিজের চাকরির পাশাপাশি ঘরে ঘরে গিয়ে রোগী দেখছি। আমার কাজ হলো, যদি ৫০ জনকেও সেবা দিয়ে হাসপাতালবিমুখ করে সুস্থ রাখতে পারি, তাহলে হাসপাতালের ওপর চাপ পড়বে না। এতে অনেক ইতিবাচক ফল দেখা যাবে।ferdousবাংলাদেশে পিপিই সংকটকে অজুহাত দেখিয়ে অনেক চিকিৎসকের সেবাবিমুখতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রে পিপিই সংকট বেশি। এখানে আমাকে একটা পিপিই দেয়া হয়েছে একদিনের জন্য। আমি পাঁচদিন পর গিয়ে আরেকটা পিপিই চেয়েছি। যখন বললাম পিপিই থেকে মরা মানুষের গন্ধ আসছে, তখন আমাকে আরেকটা দেয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে কাজ করছি। উপায় না দেখে নিজের পিপিই নিজেই বানিয়েছি।

বিজ্ঞাপন

নিউইয়র্ক মৃত্যুপুরী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহর ও অঙ্গরাজ্য থেকে প্লেনভর্তি হয়ে চিকিৎসকরা এখানে নিজ খরচে সেবা দিতে আসছেন জানিয়ে ডা. ফেরদৌস বলেন, ওই চিকিৎসকরা এখানে না এলেও পারতেন, তারা ঘুমাতে পারতেন অন্যদের মতো। কিন্তু তারা আসছেন নিজের খরচে, তারা আমাদের পেছনে দাঁড়িয়েছেন। এমন সংকটকালে মানবিকতাকে যদি নিজের স্কিলের সঙ্গে যোগ করতে না পারা যায়, তাহলে জীবনের শেষান্তে দেখা যাবে কিছু নেই।

নিউইয়র্কের বাসিন্দা কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিউইয়র্কে বিপুলসংখ্যক কাগজপত্রহীন অভিবাসী রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও রয়েছেন। করোনাভাইরাস মহামারির এই সময়েও এসব কাগজপত্রহীন মানুষের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা নেই। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।

আর এই মহাদুর্যোগে তাই হাজারো ঝুঁকি মাথায় নিয়ে মানুষের পাশে, বিশেষত স্বদেশিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের ডা. ফেরদৌস। দ্বারে দ্বারে গিয়ে বিপদাপন্ন মানুষকে সেবা দেয়ার পাশাপাশি ডা. ফেরদৌস করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফনের খরচও দিচ্ছেন।

বিপদাপন্নদের খাবার ও অর্থ সাহায্য পৌঁছে দেয়ার জন্য ডা. ফেরদৌস গঠন করেছেন একটি স্বেচ্ছাসেবী দল। জ্যাকসন হাইটসে নিজের কার্যালয়ে স্থাপন করেছেন একটি কন্ট্রোল রুম। সেই রুম থেকে প্রত্যহ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলছে নানা ধরনের সেবামূলক কাজ। ওই রুমের একটি ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে সবার জন্য। সহায়তা চেয়ে অনেকে সেই ফোন নম্বরে যোগাযোগ করছেন। অনেকে এসে খাবার নিয়ে যাচ্ছেন। আবার বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার পৌঁছে দিতে হচ্ছে।

এ কাজে ডা. ফেরদৌসকে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। ডা. ফেরদৌসের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা বেগম দিনা, দুই ছেলে আকিব খন্দকার ও নাকিব খন্দকারও প্রত্যক্ষ সহায়তা করছেন এ সেবামূলক কাজে। কাজ করে যাচ্ছেন তার স্বেচ্ছাসেবী দলের সদস্য আবু ইউসুফ টিটু, আবদুল্লাহ আল মারুফ এবং জুয়েল নূর।ferdousএমন মহৎপ্রাণ চিকিৎসকের এ ধরনের সেবার খবর কমিউনিটি ছাড়িয়ে ছড়িয়েছে নিউইয়র্কবাসীর মধ্যে। সেজন্য ভূয়সী প্রশংসায় ভাসছেন ডা. ফেরদৌস।

অনেকে বলছেন, হঠাৎ সারাবিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয়া করোনার কারণে সারাবিশ্বেই চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশও চিকিৎসকদের পিপিই দিতে পারছে না। সেখানে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশ এই সংকটের বাইরে থাকবে, এমনটা ভাবা যায় না। কোথাও কোথাও পিপিই বা সামগ্রী না পাওয়ার বিষয়টিকে অজুহাত বানিয়ে অনেক চিকিৎসক তার সেবা কার্যক্রম থেকে আড়ালে চলে গেলেও ডা. ফেরদৌস জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যাচ্ছেন দ্বারে দ্বারে। ঘুরছেন মৃত্যুপুরী নিউইয়র্কে স্বদেশিদের আশার আলো হয়ে।

রীতিমত ‘সুপার হিরো’ বনে যাওয়া ডা. ফেরদৌস খন্দকারকে নিয়ে নিউইয়র্কে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি বলছেন, এই চিকিৎসক শুধু কমিউনিটিরই নয়, সারা বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন এমন উন্নত জনপদে। তার জন্য বাংলাদেশি কমিউনিটি গর্বিত।

ডা. ফেরদৌস খন্দকার জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে সেবা দেয়ার অভিজ্ঞতা যদি তার কাছ থেকে বাংলাদেশ নিতে চায়, তবে তিনি ঢাকায় আসতে চান । এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বাংলাদেশ যদি মনে করে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধার প্রয়োজন আমি আসবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here