ঈর্ষণীয় অবস্থানে অর্থনীতি

0
46

তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর অনেক দেশের জন্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব পরিমন্ডলে। স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে স্বনির্ভর আর স্বাবলম্বী বাংলাদেশ এক অনন্য অর্জন। লজ্জা নিবারণ আর শীতের হাত থেকে রেহাই পেতে যেখানে বিদেশ থেকে খয়রাতির কম্বল মুড়ি দিয়েছিল যে জাতি, সে জাতিই আজ পুরো উন্নত বিশ্ববাসীর জন্য নামিদামি ব্র্যান্ডের কাপড় প্রস্তুত করছে, অর্জন করছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। বিশ্বব্যাংকের মানদন্ড অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশমুখে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতে, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা আর অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সূচকেও অনন্য অর্জন রয়েছে বাংলাদেশের।

শুধু তাই নয়, একসময় বৈদেশিক সহায়তা ছাড়া চলতে না পারা বাংলাদেশ এখন নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়া মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নেও বাংলাদেশ তার সক্ষমতা প্রমাণ করছে। একসময়ের ক্ষুধা আর দারিদ্র্যে জর্জরিত জাতির দুর্নাম ঘুচিয়ে খাদ্যেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ফলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রাপ্তির শেষ নেই বাংলাদেশের।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, ব্র্যাক চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর ভঙ্গুর এক অর্থনীতি নিয়ে পথ চলা শুরু করলেও কম সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। বিশেষ করে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, উচ্চতর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন আমাদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক। তবে সব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে এর চেয়েও ভালো করা সম্ভব ছিল বাংলাদেশের জন্য।’

 

উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ২ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত অর্থবছর (২০১৯-২০) শেষে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলার। এর আগের অর্থবছর ছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার। অর্থাৎ দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় এক বছরের ব্যবধানে ১৫৫ ডলার বেড়েছে। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। এর ৪৯ বছর পর বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আর জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বিশ্বের অনেক দেশের জন্য বাংলাদেশ একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে। খোদ বিশ্বব্যাংক বলছে, দ্রুত ও টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। ভারতের প্রখ্যাত দুই অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও কৌশিক বসুর ভাষায় বাংলাদেশ হচ্ছে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের প্রথম দিকে বিশ্বব্যাপী শুরু হওয়া মহামারী করোনাভাইরাসের ধাক্কায় সারা বিশ্বের অর্থনীতি যেখানে বিপর্যস্ত, ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশই যেখানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে, একমাত্র বাংলাদেশই সেখানে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে রয়েছে। এমনকি করোনা মহামারীতে এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশও বাংলাদেশ।

বাম্পার কৃষিজ উৎপাদন আর বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের জয়জয়কারের ফলে করোনা মহামারীতেও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি মোটেও কমেনি। বাড়ছে রপ্তানি আদেশও। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। একটি দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ থাকলেই সে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে সঠিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের হাতে এ মুহূর্তে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার বিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত ১৮ মাসের আমদানি দায় মেটানো সম্ভব। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই প্রচ- খরা, বন্যার পাশাপাশি ’৭৪ সালে চরম দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করতে হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের রেখে যাওয়া নানা জঞ্জাল এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা টানতে হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশকে। অথচ অদম্য এ জাতির অক্লান্ত পরিশ্রম আর একাগ্রতা মাত্র ৪৯ বছরে বাংলাদেশকে করে তোলে সমৃদ্ধিশালী। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনেই বিশ্বের অনেক দেশের কাছে বাংলাদেশ মডেল হিসেবে গ্রহণীয়। এখন স্বল্প সময়ের মধ্যে ২ অঙ্কের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ যে হারে এগিয়েছে, তা সত্যি অনেকের জন্য ঈর্ষণীয়। অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দারুণ সাফল্য অর্জন করেছি। পৃথিবীর অনেক দেশই আমাদের অনুসরণ করছে।’ তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারীতেও বাংলাদেশ তার সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। অদম্য বাঙালি জাতি কোনো বিপদ কিংবা বাধাকে ভয় পায় না তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ যেখানে ধরাশায়ী, সেখানে এ মহামারীতেও আমরা উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছি। সবচেয়ে বড় কথা, দেশে কোনো খাদ্য সংকট নেই। এ ছাড়া নেই কোনো অর্থনৈতিক সংকট।’ ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘এখন আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে গর্ব করে বলতে পারি, সেই তলাবিহীন ঝুড়ি আজ বিশ্বের বিস্ময়, উন্নয়নের এক রোল মডেল। স্বাধীনতার সময়ে অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে পাকিস্তান এগিয়ে ছিল। আজ ৪৯ বছর পর ৫০ বছরে পদার্পণের সময় পুরো উল্টো চিত্র। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকেই পাকিস্তান এখন বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে। এটিই আমাদের স্বাধীনতার বড় অর্জন।’ এদিকে হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি)-এর সর্বশেষ গ্লোবাল রিসার্চে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর নিরিখে বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, বর্তমানে এ দেশের অবস্থান এখানে ৪২তম। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ২০৩০ : আওয়ার লং-টার্ম প্রজেকশন্স ফর ৭৫ কান্ট্রিজ’ শিরোনামের এ রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১৬ ধাপে উন্নীত হবে, যা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ তালিকায় বাংলাদেশের পরই ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার নাম থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এইচএসবিসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here