দেশে করোনার টিকাদান শুরু আজ, টিকায় স্বস্তির হাওয়া

0
118

 

করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। আজ রোববার সারাদেশে একযোগে টিকাদান শুরু হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নিজে টিকা নিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। সকাল ১০টায় রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তিনি টিকা নেবেন। এরপরই সারাদেশে একযোগে ১০০৫টি কেন্দ্রে টিকাদান শুরু হবে।

প্রথম দিনে রাজধানী ঢাকা, বিভাগীয় শহর, জেলা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কেন্দ্রগুলোতে টিকা দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে বিশেষ করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে শুরুতেই টিকা দেওয়া হচ্ছে না।

তবে টিকা গ্রহণে মানুষের সাড়া এখনও কম। নিবন্ধন অ্যাপে গতকাল পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখের মতো মানুষ আবেদন করেছে। সাড়া কম থাকায় নিবন্ধন নীতিমালায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, নিবন্ধন না করলেও কেন্দ্রে এসে মানুষ টিকা নিতে পারবেন। টিকা নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র আনলেই হবে।

এদিকে শেষ সময়েও সরকারি টিকাদান কেন্দ্রগুলো শতভাগ প্রস্তুত নয়। তবে টিকাদান শুরুর আগে ঘাটতি দূর করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি ‘এ’ মানের :প্রথম দিনে সারাদেশে এক হাজার ৫টি হাসপাতালে টিকাদান শুরু হবে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ৫০টি কেন্দ্র এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৯৫৫টি হাসপাতালে কেন্দ্র রয়েছে। ঢাকার ৫০ কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের ২০৪টি দল এবং ঢাকার বাইরে ২ হাজার ৪০০টি দল টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রতিটি দলে দু’জন স্বাস্থ্যকর্মী ও দু’জন স্বেচ্ছাসেবী থাকবেন। এছাড়াও টিকাবিষয়ক কার্যক্রমের জন্য সাত হাজার ৩৪৪টি টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে প্রথম দিনে ২ হাজার ৪০০ জনকে দিয়ে কাজ শুরু করা হবে।

টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে সরকার। শুরুতে টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, এরপর টিকার দাম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা এবং সবশেষে টিকার বিভিন্ন দিক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারও চলেছে। এসব পরিস্থিতি সামলে নির্ধারিত সময়ে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করাই ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ভারতের উপহারের ২০ লাখ ডোজ এবং কেনা টিকার ৫০ লাখ ডোজ হাতে পেয়ে সরকার সেই চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করেছে। সরকারের সামনে দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল টিকা গ্রহণের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে। সেই চ্যালেঞ্জেও সফল।

গত ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ওইদিন টিকা নেওয়া ২৬ জন এবং পর দিন টিকা গ্রহণকারী ৫৪১ জনের সবাই সুস্থ আছেন।

এখন সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ টিকা গ্রহণে মানুষকে আগ্রহী করে তোলা। মানুষের মধ্যে টিকা নিয়ে ভীতি দূর করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে- মন্ত্রী, এমপি ও উচ্চপদস্থ আমলারা শুরুতেই টিকা নেবেন। সরকার মনে করছে, শুরুতে তারা টিকা নিলে টিকা গ্রহণে মানুষের আগ্রহ বাড়বে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, টিকাদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এমপিদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার কেন্দ্র থেকে প্রথম দিনেই টিকা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মন্ত্রীদের নিজ নির্বাচনী এলাকা অথবা রাজধানীর যে কোনো টিকাদান কেন্দ্র থেকে টিকা নিতে বলা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদেরও প্রথম দিন টিকা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

টিকাদান কেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতিতে এখনও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে আজ সকালে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর আগেই তা ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল শনিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি ‘এ’ মানের। অর্থাৎ ১০০-এর মধ্যে ৭৫ নম্বর পেলে ‘এ’ মানের হয়।

এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, ঢাকার অনেক কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে দেখা হয়েছে। সবগুলোতেই প্রস্তুতি মোটামুটি ভালো। আশা করছি, কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা যাবে। তবে কিছু কিছু ছোট কেন্দ্রে বিশেষ করে মাতৃসদনের মতো কেন্দ্রগুলোতে প্রস্তুতির কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এ কেন্দ্রগুলোও টিকাদান শুরুর আগেই প্রস্তুত হয়ে যাবে বলে আশা করছি।

সাড়া কম, পরিকল্পনায় পরিবর্তন :টিকা নিতে সুরক্ষা নামে ওয়েবসাইটে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছিল সরকার। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী এতে সাড়া মিলছে না। নিবন্ধন অ্যাপে গতকাল পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখের মতো মানুষ আবেদন করেছেন। এ অবস্থায় শর্ত শিথিল করা হয়েছে। টিকাকেন্দ্রেই নিবন্ধন করতে পারবে মানুষ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, নিবন্ধন না করলেও টিকাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে টিকা নিতে পারবেন- এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। টিকাদানের আগে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে টিকা গ্রহীতার সব তথ্য রেখে দেওয়া হবে। পরে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা তা ডাটাবেজে তুলে দেবেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, অনেকের কাছে স্মার্টফোন নেই। আবার কারও কারও বাসায় ল্যাপটপ ও কম্পিউটার নেই। আবার অনেকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নিবন্ধন করার মতো দক্ষতা নেই। এ কারণে অধিকাংশ মানুষ নিবন্ধন করতে পারছেন না। এসব চিন্তা করেই টিকাকেন্দ্রে নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ টিকাকেন্দ্রে আসা কাউকে টিকা ছাড়া ফেরত পাঠানো হবে না। এ জন্যই কেন্দ্রগুলোতে নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সবাইকে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা মানুষকে কেন্দ্রে নিয়ে আসবেন। প্রাপ্যতা অনুযায়ী সবাইকে টিকা নিতে উৎসাহিত করবেন, নিবন্ধন করাবেন।

টিকা নিয়ে কোনো ভীতি নেই উল্লেখ করে জাহিদ মালেক বলেন, গত ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি যাদের টিকা দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই সুস্থ আছেন। সুতরাং টিকা নিয়ে যে ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছিল, তা ভিত্তিহীন। সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা নির্ভয়ে টিকা নিন, করোনামুক্ত থাকুন।

সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চাইছে সরকার। এ জন্য টিকাদানের পরিকল্পনায় শেষ মুহূর্তে বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথমদিকে প্রতিদিন দুই লাখ মানুষকে টিকাদানের পরিকল্পনা থাকলেও তা কমিয়ে আনা হয়েছে। এর পেছনে কারণ নিবন্ধনে মানুষের সাড়া কম থাকা।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ বলছে, সাড়া কম থাকাই পরিকল্পনা পরিবর্তনের মূল কারণ নয়। বিশ্বব্যাপী টিকা নিয়ে এক ধরনের সংকট তৈরি ইউরোপের অনেক দেশ চুক্তি অনুযায়ী অক্সফোর্ডের টিকা পাচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে তিন কোটি ডোজ পাবে বাংলাদেশ। তবু টিকা পৌঁছানোর জটিলতার বিষয়টি মাথার রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান সমকালকে বলেন, বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে অক্সফোর্ডের টিকার ৭০ লাখ ডোজ মজুদ আছে। প্রত্যেককে দুই ডোজ হিসাব করে প্রথম ৩৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সরকার প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা পাবে। এভাবে কেনা টিকার আরও দুই কোটি ৫০ লাখ ডোজ আসবে। এর মধ্যেই কোভ্যাক্সের টিকার একটি বড় ডোজ চলে আসবে। ওই টিকা হাতে আসার পর পরিকল্পনায় আবার পরিবর্তন আনা হবে।

কে কোথায় টিকা নেবেন

জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ কর্মকর্তারা কে কোথায় টিকা নেবেন তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মন্ত্রী, এমপিদের টিকা দেওয়ার জন্য মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে নির্ধারণ করা হয়েছে।

উচ্চ আদালতের বিচারক ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকা নেবেন। আবার সচিব, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কোথায় টিকা নেবেন সেটিও ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এমপিরা নিজ নিজ এলাকার টিকাকেন্দ্রে টিকা নেবেন। এর বাইরেও কেউ চাইলে নিজেদের পছন্দ মতো জায়গায় টিকা নিতে পারবেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম জানান, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হাসান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টিকা নেবেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড পল্গাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে টিকা নেবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

প্রথম ধাপে যারা পাবেন

প্রথম ধাপে ১৫ ক্যাটাগরির মানুষ টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মহামারি মোকাবিলায় নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী, ৫৫ বছরের ওপরে বয়সী জনগোষ্ঠী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, বিচার বিভাগ, মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাকর্মী, ব্যাংক-বীমার কর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও অগ্নিনির্বাপণকর্মী, এনজিওকর্মী, দাফন ও সৎকারকর্মী, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত ব্যক্তি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here